ছাতকে জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ড: পুলিশ ও বাদীকে মেনেজ করতে মরিয়া লন্ডন প্রবাসী তাজ উদ্দিন

প্রকাশিত:রবিবার, ০৯ ফেব্রু ২০২৫ ০৯:০২

ছাতকে জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ড: পুলিশ ও বাদীকে মেনেজ করতে মরিয়া লন্ডন প্রবাসী তাজ উদ্দিন

Manual5 Ad Code

সুরমাভিউ:-  সিলেট শহরে যাওয়ার কথা বলে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে বের হন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সিংচাপইড় ইউনিয়নের গহরপুর গ্রামের জিয়াউর রহমান (৫৫)। এর দুইদিন পর অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর পার্শবর্তী মহদী গ্রামের একটি খাল থেকে তার বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার দীর্ঘ পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এছাড়া কোন আসামীকেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহভাজনরা পুলিশ এমনকি হত্যা মামলার বাদী ও নিহতের সৎ ভাই তাজিজুর রহমান বুদুরকে ম্যানেজ করে মামলা ধামাচাপা দিতে লিপ্ত রয়েছে।

হত্যাকান্ডের প্রধান সন্দেহভাজন একই গ্রামের লন্ডনপ্রবাসী বিএনপি’র বহিস্কৃত নেতা তাজ উদ্দিন ওরফে সারওয়ার আহমদ প্রভাবশালী হওয়ার কারণে পুলিশের সাথে সাথে মামলার বাদী নিহতের সৎ ভাই তাজিজুর রহমান বুদুরকে সহজেই ম্যানেজ করে নিয়েছেন বলে নিহত জিয়াউর রহমানের স্ত্রী রানু বেগম অভিযোগ করেছেন।

Manual5 Ad Code

হত্যাকান্ডের সঠিক বিচার প্রাপ্তি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে ইতোমধ্যেই সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহতের স্ত্রী রানু বেগম। সংবাদ সম্মেলনে মামলার বাদী নিহতের সৎভাই তাজিজুর রহমান বুদুরের সন্দেহজনক আচরণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন একই গ্রামের লন্ডনপ্রবাসী তাজ উদ্দিন ওরফে সারওয়ার আহমদের সঙ্গে তার দৃশ্যমান সখ্যতার অভিযোগ এনে মামলার বাদী পরিবর্তনের দাবী জানান।

Manual2 Ad Code

নিহতের স্ত্রী রানু বেগম ও তার ছেলে সালমান আহমদকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনে গত ৩১ জানুয়ারি ছাতক থানায় তিনি একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি নং-১৫৬২) করেছেন। তার অভিযোগ, তার স্বামীর হত্যাকারীদের সাথে আঁতাত করে হত্যা মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত দেবর তাজিজুর রহমান বুদুর। তিনি হত্যাকান্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ও ষড়যন্ত্রের মূলহোতা লন্ডন বিএনপি’র বহিস্কৃত নেতা তাজ উদ্দিন ওরফে সারওয়ার আহমদের টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন। তাজ উদ্দিন টাকার জোরে শুধু বাদী নয়, পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদেরও ম্যানেজ করে নিয়েছেন বলে নিহতের স্ত্রীর অভিযোগ।

লন্ডন থেকে একটি বিশ্বস্ত সুত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের লন্ডন সিটির নিউহ্যাম এলাকায় তাজ উদ্দিন (৫১) একজন চিহ্নিত দুস্কৃতিকারী হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৪ সালে এক নাবালিকাকে অপহরণ ও ধর্ষণের অপরাধে ৫ বছরের সাজা হয় তার। এছাড়াও মাদক সেবন, মাদক বিক্রি, প্রতারণা ইত্যাদি নানা অপরাধে লন্ডনেও তিনি ইতোমধ্যেই চার বার কারাভোগ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েক বছর আগেই তাজ উদ্দিনকে লন্ডন বিএনপি’র স্থানীয় শাখা থেকে বহিস্কার করা হয়।

উল্লেখ্য, ১৬/১৭ বছর আগে বিএনপি’র বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন লন্ডন গিয়েছিলেন, তখন কোন এক সুযোগে উক্ত তাজ উদ্দিন দলীয় নেতা তারেক রহমানের সাথে একটি ফটো তুলে নেন। আর ওই ফটো ব্যবহার করে ‘তারেক রহমানের কাছের মানুষ’ পরিচয়ে তিনি এখন দেশে-বিদেশে নানা অপকর্মে লিপ্ত। এমন কী প্রশাসনকে প্রভাবিত করতেও তিনি ওই ‘ফটো বাণিজ্য’ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে তার নাম তাজ উদ্দিন হলেও লন্ডনে নানা অপকর্মে জড়িত থাকার দায়ে বিভিন্ন মামলা থেকে বাঁচতে নিজের নামের সাথে নতুন করে সারওয়ার আহমদ যুক্ত করেছেন।

নিহতের স্ত্রী রানু বেগম জানান, তার স্বামীর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধারের পর তাকে না জানিয়ে তার সৎ দেবর তাজিজুর রহমান বুদুর তাড়াহুড়ো করে একটি হত্যা মামলা (ছাতক থানার মামলা নং-১২/২৪, তারিখঃ ১২/০৯/২৪, জিআর মামলা নং-১৯৯/২৪) দায়ের করেন। অথচ, তাজিজুর রহমান বুদুর বেশ কয়েক বছর আগে গহরপুর গ্রামের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু, মামলার পর থেকে হত্যাকান্ডের প্রধান সন্দেহভাজন একই গ্রামের লন্ডনপ্রবাসী বিএনপি নেতা তাজ উদ্দিন ওরফে সারওয়ার আহমদের সঙ্গে তার সখ্যতার কারণে বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হত্যার পেছনে যাদের হাত রয়েছে, তাদের সাথে পরামর্শ করেই তার সৎ দেবর তাজিজুর রহমান বুদুর মামলাটি করেছেন। মামলার পর থেকে তার আচরণও সন্দেহজনক বলে দৃশ্যমান হচ্ছে।

মামলার বাদী পরিবর্তন এবং কোনো গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্তের দাবি জানান জিয়াউর রহমানের স্ত্রী রানু বেগম। তিনি বলেন, অন্যথায় হত্যার সঙ্গে জড়িতরা পার পেয়ে যাবে। আমরা সঠিক বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবো।

Manual8 Ad Code

গহরপুর গ্রামের লন্ডন প্রবাসী বিএনপি’র বহিস্কৃত নেতা তাজ উদ্দিন ওরফে সারওয়ার আহমদের  সাথে জমি-জমা নিয়ে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের পূর্ব বিরোধ ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, বছরখানেক আগে তাজ উদ্দিনের লোকজন একটি মামলায় আমাদের গোষ্ঠী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। সেই মামলায় আমার স্বামীকে স্বাক্ষী হিসেবে রাখা হয়। কিন্তু পরিবারের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। সেই মামলার রায় তাজ উদ্দিনের বিপক্ষে যায়। এরপর থেকে তাজ উদ্দিন আমার স্বামীকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়।

রানু বেগম অভিযোগ করেন, ১০/১২ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাজ উদ্দিন দেশ ছেড়ে যান। সম্প্রতি দেশে ফিরলে হত্যাকাণ্ডের আগের দিন আমার স্বামীকে দোকান থেকে ডেকে নেন। রাতে বাড়ি ফিরলে আমার স্বামীকে খুবই বিষন্ন দেখায়। একদিন পর তাকে অপহরণ ও খুন করা হয়।

Manual2 Ad Code

বাদী তাজিজুর রহমান বুদুরের সঙ্গে তাজ উদ্দিনের নিয়মিত যোগাযোগের অভিযোগ করে বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন রানু বেগম। তিনি জানান, এ কারণে তিনি নিজে বাদী হয়ে তাজ উদ্দিন ও তাজিজুর রহমান বুদুর, গ্রামের জয়নাল আবেদিন, রাজু মিয়া, গৌছ উদ্দিনকে অভিযুক্ত করে সুনামগঞ্জ আমল গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দরখাস্ত মামলা (সিআর মামলা নং-৪৮৮/২৪) দায়ের করেছেন। আদালত একই ঘটনায় থানায় মামলা থাকার কারণে পুলিশকে দ্রুত প্রতিবেদন পেশের নির্দেশ দেন এবং আমার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। মামলা থেকে বাঁচতে তাজ উদ্দিন এরই মধ্যে দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন বলে জানান তিনি। স্বামীর প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তিনি আইনশৃংখলাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল কবির জানান, হত্যা মামলাসহ নিহতের স্ত্রীর দায়েরকৃত অভিযোগ দু’টোই তদন্তাধীন রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ