১৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৩০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ ১০:০৬
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল দল জার্মানি। যে দলটি অসংখ্যবার বড় মঞ্চে চাপ সামলে বিজয়ের হাসি হেসেছে, সেই জার্মানিই এবার থেমে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত রাতে। আর সেই রাতটিকে নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায়ে পরিণত করল প্যারাগুয়ে।
বস্টনের গ্যালারিতে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই ছিল সমানে সমান। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময় শেষে স্কোরলাইন ১-১। এরপর ভাগ্য নির্ধারণের মঞ্চ টাইব্রেকারে আরও দৃঢ়, আরও সাহসী দল হিসেবেই নিজেদের প্রমাণ করে প্যারাগুয়ে। গোলরক্ষক ওর্লান্দো হিলের অবিশ্বাস্য দুটি সেভ আর শেষ পর্যন্ত জোসে কানালের স্নায়ুচাপ সামলে নেওয়া নিখুঁত শট, এই দুই মুহূর্তেই লেখা হয়ে যায় বিশ্বকাপের আরেকটি স্মরণীয় অঘটনের গল্প।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল জার্মানির পায়ে। প্রথমার্ধে প্রায় ৭৮ শতাংশ পজেশন নিয়েও গোলমুখে কার্যকর হতে পারেনি ইউলিয়ান নাগেলসমানের দল। বরং অপেক্ষা করছিল প্যারাগুয়ে। নিজেদের অর্ধে রক্ষণ গুছিয়ে রেখে সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনা নিখুঁতভাবেই কাজে লাগায় তারা।
৪২তম মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ডান প্রান্ত থেকে ভেসে আসা দারুণ এক ক্রসে বক্সের ভেতরে অরক্ষিত অবস্থায় হেডে বল জালে পাঠান হুলিও এন্সিসো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দীর্ঘ গোলখরা কাটিয়ে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে, আর মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় জার্মান সমর্থকদের গ্যালারি।
বিরতির পর অবশ্য ভিন্ন চেহারায় মাঠে নামে জার্মানি। আক্রমণের গতি বাড়িয়ে একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে তারা। অবশেষে ৫৪তম মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভার্টজের দারুণ ক্রসে শক্তিশালী হেডে সমতায় ফেরান কাই হাভার্টজ। এরপরও এগিয়ে যাওয়ার একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল জার্মানরা, কিন্তু প্রতিবারই দেয়াল হয়ে দাঁড়ান ওর্লান্দো হিল কিংবা ব্যর্থ হয় শেষ মুহূর্তের ফিনিশিং।
অতিরিক্ত সময়েও নাটকীয়তার কমতি ছিল না। ১০২তম মিনিটে জোনাথান টাহ বল জালে জড়ালেও ভিএআরের সাহায্যে গোল বাতিল করেন রেফারি। গোলের আগে জার্মানির একজন খেলোয়াড় গোলরক্ষক হিলকে বাধা দিয়েছিলেন বলে সিদ্ধান্ত আসে। সেই মুহূর্তে হয়তো ভাগ্যও প্যারাগুয়ের পক্ষেই ছিল।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ওর্লান্দো হিল। জার্মানির প্রথম শট নেওয়া কাই হাভার্টজের প্রচেষ্টা ফিরিয়ে দেন তিনি। পরে নিক ভল্টেমাডের শটও অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন। যদিও প্যারাগুয়েও মাঝপথে দুটি সুযোগ নষ্ট করে জার্মানিকে ম্যাচে ফিরতে দিয়েছিল, তবু সাডেন ডেথে আর ভুল করেননি জোসে কানালে। তার বাঁ পায়ের শক্তিশালী শট জালে জড়াতেই আনন্দে ভেসে যায় প্যারাগুয়ের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা।
এই জয় শুধু একটি নকআউট ম্যাচ জেতার গল্প নয়। এটি আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য আর বিশ্বাসের গল্প। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের আগের পাঁচ ম্যাচে কোনো গোল করতে না পারা দলটি এবার শুধু সেই খরা কাটায়নি, বিদায় করে দিয়েছে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সফল জাতিকে। জার্মানির বিপক্ষে তিন দেখায় এটিই প্যারাগুয়ের প্রথম জয়, আর বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে দুইবার গিয়ে দুইবারই জয়ের হাসি ধরে রাখল তারা।
অন্যদিকে, জার্মানির জন্য এটি আরেকটি হতাশার অধ্যায়। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর গত দুটি আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। এবার বহু প্রত্যাশা নিয়ে নকআউটে ফিরেও প্রথম ধাপেই থেমে গেল যাত্রা। বলের দখল, অভিজ্ঞতা আর তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড, সবকিছুই ছিল তাদের পক্ষে। কিন্তু ফুটবল আবারও মনে করিয়ে দিল, ইতিহাস নয়, ফল নির্ধারণ করে মাঠের লড়াই আর মুহূর্তের দৃঢ়তা।
এখন প্যারাগুয়ের সামনে আরও বড় পরীক্ষা। কোয়ার্টার-ফাইনালে তাদের অপেক্ষায় থাকবে ফ্রান্স অথবা সুইডেন। তবে জার্মানিকে বিদায় করে যে আত্মবিশ্বাস, সাহস আর লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে গুস্তাভো আলফারোর দল, তাতে এবারের বিশ্বকাপে তাদের আর কোনোভাবেই আন্ডারডগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কখনও কখনও একটি রাতই বদলে দেয় একটি দলের ইতিহাস, আর বস্টনের এই রাতটি নিঃসন্দেহে প্যারাগুয়ের ফুটবল ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে।
Helpline - +88 01719305766