১৪ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রকাশিত:শনিবার, ২৯ আগ ২০২৬ ১০:০৮
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “আওয়ামী লীগকে যেসব অভিযোগে ক্ষমতা থেকে বিদায় করা হয়েছিল, বর্তমান সরকারও প্রায় একই পথে এগোচ্ছে। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, দমন-পীড়ন, লুটপাট ও দলীয়করণ আবারও ফিরে এসেছে। শুধু দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে, কাজ একই রয়েছে।”
তিনি বলেন, “মানুষ চেয়েছিল দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ। চেয়েছিল, ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন হবে না, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি হবে না, বিদেশে অর্থ পাচার হবে না এবং অন্যায়ভাবে কাউকে জেল-জুলুম, হত্যা, মামলা, রিমান্ড বা আয়নাঘরে নেওয়া হবে না।”
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে খুলনার তেরখাদা নতুন বাসস্ট্যান্ড চত্ত্বরে তেরখাদা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল।
তেরখাদা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং উপজেলা সেক্রেটারি সাবেক ছাত্রনেতা নাহিদ হাসানের সঞ্চালয় কর্মী সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা জেলা আমির মাওলানা মুহা. এমরান হুসাইন, নায়েবে আমির মাওলানা কবিরুল ইসলাম, সেক্রেটারি মুন্সী মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সী মঈনুল ইসলাম, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক স ম এনামুল হক, জেলা অফিস সেক্রেটারি মো. আশরাফুল আলম। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন— রূপসা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা লাবীবুল ইসলাম, তেরখাদা উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা এম এ হাফিজ, সাজ্জাদুর রহমান রাসেল, মাহফুজুর রহমান, আকতার ফারুক, মাওলানা গোলাম রব্বানী, মাওলানা আব্দুস সালাম জাহেদী, তেরখাদা সদর থানা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মিল্লাত হোসেন প্রমুখ।
সমাবেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরের মধ্যে বিভিন্ন দল ক্ষমতায় এসেছে। মানুষ তাদের দেখেছে। সবার মধ্যেই চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের অভিযোগ ছিল। তাই, মানুষ ভেবেছিল, ইসলামপন্থী ও আল্লাহওয়ালা মানুষকে একবার দেশ পরিচালনার সুযোগ দিয়ে দেখা যাক। এ আস্থার কারণেই গত নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জোয়ার তৈরি হয়েছিল।”
নির্বাচনের পর দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “ঈমানদার মুসলমান কখনও হতাশ হয় না। তবে, দেশের অবস্থা ভালো নয়। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন, লুটপাট ও দলীয়করণ আবারও বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ খারাপ, বিদায় করো ফ্যাসিবাদ— এসব স্লোগান দিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি। যে যে দোষে তাদের বিদায় করেছিলাম, প্রায় সেই লাইনেই তো যাচ্ছে।”
সরকারের পক্ষ থেকে ছয় মাসকে অল্প সময় বলা হলেও তিনি তা মানতে নারাজ। ইংরেজি প্রবাদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সকাল দেখেই যেমন দিন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, তেমনি ছয় মাসও কম সময় নয়।”
কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, নির্বাচনের আগে এসব কার্ডের মাধ্যমে কৃষক, গরিব মানুষ ও সাধারণ পরিবারের অভাব দূর করার কথা বলা হলেও এখন দলীয় বিবেচনায় তালিকা তৈরির অভিযোগ উঠছে।
তিনি বলেন, বিএনপির বাইরে অন্য দলের মানুষের নাম তালিকায় না রাখার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মসজিদের ইমাম-খতিবদের সম্মানি, ভাতা, রাস্তা-ঘাট, কাবিখার অর্থসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা দলীয়করণের অভিযোগও করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আওয়ামী লীগ তো ওইটাই করতেছিল। আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারও কার্ড থাকবে না, কারও ভাতা হবে না, এমন দলীয়করণের বিরুদ্ধেই তো বিএনপির সঙ্গে আমরা রাজপথে সংগ্রাম করেছি।”
খুলনার বিভিন্ন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সরেজমিনেও বিভিন্ন এলাকার অবস্থা দেখেছেন। তার দাবি, রূপসায় ঘরে ঘরে সন্ত্রাস ও মাস্তানি বেড়েছে। অস্ত্র নিয়ে সংঘাত চলছে। তিনি ‘বি কোম্পানি’র প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “নির্বাচনের মাধ্যমে যে পরিবর্তন মানুষ চেয়েছিল, তা পাওয়া যায়নি। আমরা যা বদলাতে চেয়েছিলাম, বদলও হয়নি। একই দিকে দেশ ধাবিত হচ্ছে। শুধু দলের নামটা বদলেছে, কাজ একই আছে।”
বক্তব্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টিও তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান থাকাকালে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রায় নয় মাসে ৭২টি বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনার মাধ্যমে সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও বিচারিক বিষয়ে ৮৪টি সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচিত কোনো সরকার আর ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে না পারে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব, সবার সমান অধিকার, চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয়করণ বন্ধ, ভিন্নমতের ওপর মামলা-হামলা ও নির্যাতন বন্ধ, চাঁদাবাজি ও লুটপাট বন্ধ— এসব ছিল সংস্কারের মূল লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী যাতে একই সঙ্গে দলীয় প্রধান না থাকতে পারেন, এমন প্রস্তাবও জুলাই সনদে ছিল এবং সব দল এতে একমত হয়েছিল।”
মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় এখন অগ্রাহ্য করার চেষ্টা চলছে। ৭০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটার জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতির আদেশে জাতীয় সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। জামায়াতসহ ১১ দলের এমপিরা দুটি শপথ নিলেও বিএনপি শুধু এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি।
এ নিয়ে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদকে সংবিধানে নেই এবং এর আইনগত ভিত্তি নেই বলে যে আপত্তি তুলছে, তার সমালোচনা করেন জামায়াতের এই নেতা।
তিনি বলেন, “একই রাষ্ট্রপতির আদেশে একই দিনে, একই সময়ে দুটি ভোট হলো। একটি ভোট মেনে আপনি এমপি হলেন, প্রধানমন্ত্রী হলেন; আরেকটি ভোট মানবেন না, এটা কীভাবে হয়?’ গণভোট ও সংবিধান সংস্কার আদেশ যদি অবৈধ হয়, তাহলে ওই একই আদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।”
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা। কিন্তু, সেটি করা হয়নি। একইসঙ্গে ১৮০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথাও ওই আদেশে বলা হয়েছে। তাঁছয় মাস বা ১৮০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পথে। সেপ্টেম্বরেই এ সময়সীমা শেষ হতে পারে।
গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির নেই যে, কোনো দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ একটি গণভোটে একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার পর সরকার ক্ষমতায় গিয়ে সেই রায় বাতিল করে দেয়।”
বিএনপির ৩১ দফার কথাও তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সংবিধান সংস্কারের জন্য কমিশন গঠনের কথা তাদের ৩১ দফার প্রথম দফাতেই বলা হয়েছিল। কিন্তু, এখন ক্ষমতায় গিয়ে মৌলিক সংস্কারের পরিবর্তে শুধু সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাংবিধানিক পরিবর্তনের ১০টি বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। তার অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদের কিছু বিষয় মানতে চাইলেও ১২ থেকে ১৪টি মৌলিক বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, এসব পরিবর্তন না হলে সংবিধানের ফ্যাসিবাদী চরিত্র দূর করা সম্ভব হবে না। ভবিষ্যতে নির্বাচিত কোনো সরকার যাতে আরেকটি ফ্যাসিবাদী সরকারে পরিণত হতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন জরুরি। প্রধানমন্ত্রী যিনি হবেন, তিনি সেই দলের প্রধান থাকতে পারবেন না, এমন প্রস্তাব জুলাই সনদে সব দল মেনে নিয়েছিল।
Helpline - +88 01719305766