১০ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৫শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ২৫ আগ ২০২৬ ১০:০৮
এম এ হান্নান:- সব ছাত্রদের প্রিয় মৌলানা স্যার, এমনকি শিক্ষকদের মধ্যেও কেউ কেউ মৌলানা স্যার আবার কেহবা মৌলানা সাহেব বলে সম্বোধন করতেন।
বলছিলাম ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পূর্বে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক অগ্রণী সৈনিক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং ইসলামী চিন্তাবিদ মৌলানা আবু আছদ মোঃ নূরুল হক সাহেবের কথা।
ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের অন্তর্গত তৎকালীন সময়ের এক প্রত্যন্ত জনপদ বাদে ঝিগলী গ্রামে ১৮৯৭ সালের ১৩ নভেম্বর মৌলানা আবু আছদ মোঃ নূরুল হক জন্ম গ্রহণ করেন। তাহার পিতা মৌলভী আছদ উল্লাহ ছিলেন তখনকার সময়ে এলাকায় একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম। পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষক।
জন্মের পূর্বেই মৌলানা নূরুল হক সাহেব পিতৃহারা হন। শৈশবে মায়ের সাথে মামার বাড়ী জগন্নাথপুর উপজেলার লোহারগাঁও কয়েক বছর অবস্থান করেন৷ পরবর্তীতে চাচা আব্দুল আজিজ সাহেবের সহিত তাঁর মায়ের পূণর্বিবাহ হয়। তাই তিনিও নিজ বাড়ীতে আবার পদার্পণ করলেন। চাচা আব্দুল আজিজ ভাতিজার প্রতি দায়িত্ব পালনে সামান্যতম কার্পণ্য করেননি। পড়াশুনার জন্যে ভর্তি করলেন খাজাঞ্চি ইউনিয়নের ইসলামপুর মাদ্রাসায় (পরবর্তিতে জামেয়া ইসলামিয়া কৌড়িয়া)। তারপর সেকেন্ডারি লেভেল সম্পন্ন করেন গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ী আলিয়া মাদ্রাসা থেকে। এরপর উচ্চ শিক্ষার্থে তিনি প্রথমে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় এবং পরে কলকাতা থেকে চলে যান ভারতের বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেওবন্দ মাদ্রাসায় এবং সেখানেই তার শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। অল ইন্ডিয়া জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ এর সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। শিক্ষা জীবন সমাপ্তির পর তিনি রাজনীতির পাশাপাশি আসামের ধূবড়ি জেলার গৌরিপুর মাদ্রাসায় সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসাবে কর্ম জীবন শুরু করেন। মাদ্রাসার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক কর্মকান্ডও একই সাথে চলতে থাকে। এসময় মৌলানা আব্দুল হামিদ খাঁন (ভাসানী) এর সাথে ছিলো তার খুবই হৃদ্যতা। রাজনৈতিক বিভিন্ন শলাপরামর্শ সহ বিভিন্ন বিষয়ে মৌলানা আব্দুল হামিদ খাঁন তার সাথে পরামর্শ করতেন। এ সময় আসামের ভাসানটেক আন্দোলনে মৌলানা আব্দুল হামিদ খানেের অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন মৌলানা নূরুল হক। এ আন্দোলনে সফল নেতৃত্বের কারণে মৌলানা আব্দুল হামিদ খানের নামের সাথে ভাসানী যুক্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তিনি সর্বত্র মৌলানা ভাসানী নামেই পরিচিতি লাভ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে মৌলানা নূরুল হক জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ এর প্রার্থী হিসেবে Member of Legislative Assembly (MLA) পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। এ নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগ প্রার্থী ছৈলার মফিজুর রহমান চৌধুরীর নিকট পরাজিত হন।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ও ভারতীয় কংগ্রেস তখন বিভিন্ন সময় একযোগে আন্দোলন করে। এ সময় কংগ্রেস সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের সহিতও তার বেশ সখ্যতা গড়ে উঠে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রাক্কালে সিলেট ছিলো আসাম প্রদেশের একটা জেলা। সিলেটের মানুষের মধ্যে তখন দ্বিধা বিভক্তি দেখা দেয়। মুসলিম লীগ সমর্থিতরা পাকিস্তানের পক্ষে এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সমর্থিতরা ভারতে থাকার পক্ষে মত দেওয়ায় বৃটিশ সরকার সিলেটে গণভোটের ব্যবস্থা করে। এ গণ ভোটের সময় মৌলানা নূরুল হক কংগ্রেস সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে সাথে নিয়ে সিলেটবাসীকে ভারতের পক্ষে ভোট দেওয়ার প্রচারাভিযান চালান। গণ ভোটে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ট রায়ে সিলেট জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মের পর মৌলানা নূরুল হক আসাম থেকে নিজ বাড়ীতে চলে আসেন।
শিক্ষকতা করে আসামের গৌরিপুর হাই মাদ্রাসায় প্রায় দুই যুগ কাটানো মৌলানা নূরুল হক আসাম থেকে বাড়ীতে এসে তাঁর সময় কাটছিলোনা। এ সময় পাশ্ববর্তী মঈনপুর এমই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন আরেক শিক্ষানুরাগী জনাব আরজদ আলী৷ আরজদ আলী স্যার মৌলানা নূরুল হক স্যারের সাথে যোগযোগ করে মঈনপুর এমই মাদ্রাসায় যোগদানের আহবান জানালে মৌলানা নূরুল হক স্যারও সানন্দে তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
আরজদ আলী স্যার ও মৌলানা নূরুল হক স্যার দুই অভিজ্ঞ শিক্ষানুরাগীর যৌথ প্রচেষ্টায় মঈনপুর এমই মাদ্রাসা আপ গ্রেডেড হয়ে ১৯৫৮ সালে জুনিয়র হাই স্কুল এবং ১৯৬২ সালে হাই স্কুলে উন্নীত হয়।
জনাব আবুল হাসনাত সাহেবকে মঈনপুর হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে মূল ভূমিকা মৌলানা স্যারই পালন করেছিলেন। মাওলানা স্যার যখন ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন তখন হাসনাত সাহেবের পিতাও দেওবন্দ মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছিলেন। সুদূর ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত দেওবন্দে একই এলাকায় দু’জনের বাড়ি হওয়ার সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মঈনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য যখন প্রধান শিক্ষক খোঁজা হচ্ছিলো তখন তিনি জানতে পারলেন ভাতগাঁওয়ের তাঁর বন্ধুর ছেলে সদ্য গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে। তিনি সাথে সাথে ভাতগাঁও গিয়ে হাসনাত সাহেবের বাবার কাছে তার ছেলেকে মঈনপুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেবার অনুরোধ করলেন এবং ঐ দিন ভাতগাঁও রাত্রীযাপন করে পরদিন হাসনাত সাহেবকে সাথে নিয়েই স্কুলে ফিরলেন এবং ঐ দিন থেকেই হাসনাত সাহেবের কর্মজীবন শুরু হয়।
শিক্ষক হিসাবে মাওলানা স্যার ছিলেন পুরো স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অসম্ভব প্রিয়। তিনি যখন ক্লাশে যেতেন পড়ানোর পাশাপাশি হাস্যরস হতো প্রচুর। তিনি বড় একটা বেত হাতে ক্লাশে ঢুকতেন। তবে এটা ছিলো তার ভয় দেখানোর একটা বাহানা। কখনো মারতেন না। দৈবাৎ কোন ছাত্র বেশী দুষ্টামী করলে তাকে ২/৩ টা বাড়ি মারতেন। তবে মৌলানা স্যারের মার ছাত্ররা হাসিমুখেই বরণ করতো। অনেক সময় ছাত্ররা ক্লাশে খুব হৈচৈ করতো। তখন তিনি একটু রাগতঃ স্বরে বলতেন ঐ খচ্চরের লেটোরা চুপ করো।
পরীক্ষার সময় স্যারের পরীক্ষার খাতায় নাম্বার দেওয়াটা ছিলো অভিনব। কোন প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি সঠিক হলে আর বানান দুই একটা ভুল হলে তা তিনি হিসাবে নিতেন না। পুরো মার্কই দিতেন। অর্থাৎ কোন ছাত্র দশটা প্রশ্নের উত্তর মোটামুটি সঠিক ভাবে লিখতে পারলে ১০০ তে ১০০ ই দিতেন। আর যদি হাতের লেখা সুন্দর হয় তাহলে আরো দশ নাম্বার বেশী দিতেন। অর্থাৎ ১১০।
মাওলানা স্যার শিক্ষকতার পাশাপাশি মঈনপুর জামে মসজিদে ইমামতিও করতেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো তিন বছর তার সংস্পর্শে থাকার। স্যার এর লজিং ছিলো মঈনপুর গ্রামের বিশিষ্ট মুরব্বী ও শালিশ ব্যক্তিত্ব জনাব হাজী আব্দুল হান্নান সাহেবের ঘরে। আর আমার লজিং ছিলো হাজী আব্দুল হান্নান সাহেবের ছোট ভাই আব্দুল কুদ্দুছ সাহেবের ঘরে।
কদ্দুছ ভাইর পরিবারে তখন তারা স্বামী স্ত্রী দুজন সদস্যই ছিলেন। তাদের মূল ঘরের একটা রুমে তখন আমি থাকতাম। মৌলানা স্যার আমাকে বল্লেন তুমি আমার কাছে চলে আসো। মসজিদের হুজরাখানায় আমার সাথে থাকবে। আর সকাল বিকাল আমার খাবারটা টিফিন ক্যারিয়ারে করে নিয়ে আসবে। এতে আর আমাকে কষ্ট করে এখানে এসে খেয়ে যেতে হবে না। আমি স্যারকে বল্লাম কদ্দুছ ভাইকে বলার জন্য। কদ্দুছ ভাইও স্যারের ছাত্র তাই না করতে পারলেন না। কিন্তু বাধ সাধলেন পারুল আপা (নজরুলের আম্মা)। তার কথা হলো আমি মসজিদে মাওলানা স্যারের কাছে চলে গেলে তিনি সন্ধ্যার পর একা ঘরে ভয় পাবেন। কদ্দুছ ভাই অনেক সময় বাজারে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বেশ দেরী করে ফিরতেন। পরে তাদের মধ্যে সমঝোতা হওয়ায় আমিও স্যারের কাছে মসজিদের হুজরা খানায় থাকতাম।
মসজিদের হুজরাখানায় তিন বছর স্যারের সাথে ছিলাম। এ সময় মঈনপুর গ্রামে একবার ভয়াবহ কলেরা মহামারী দেখা দেয়। প্রায় দেড়শ’র মত লোক কলেরায় মারা যায়। মসজিদ থেকে আমার লজিং বাড়ী যাওয়ার সময় মঈনপুর গ্রামের পঞ্চায়েতি গোরস্তানের পাশে দিয়ে যেতে হতো। কলেরার কারণে সন্ধ্যার পর পুরো গ্রাম নীরব নিস্তব্ধ হয়ে পড়তো। আমি স্যারকে বল্লাম যে রাতের খাবারের জন্য আমি গোরস্তানের পাশ দিয়ে যেতে পারবো না। আমার ভয় করে। স্যার আমাকে একটা টর্চ লাইট ব্যবস্থা করে দিলেন আর সেই সাথে পবিত্র কোরআনের একটা আয়াত মুখস্ত করালেন এবং বল্লেন, এই দোয়া পড়তে পড়তে যাবে ইনশা আল্লাহ কোন বালা মুসিবত, জ্বিন, ভূত এমন কি কোন সাপ বিচ্ছুও তোমার ধারে কাছে আসবে না। দোয়াটি হলো “সালামুন আ’লা নুহিন ফিল আলামিন”। যেখানে মঈনপুর গ্রামের লোকজন প্রায় একমাস সন্ধ্যার পর কলেরার দেও(!) এর ভয়ে ঘর থেকে বের হতো না,আমি সত্যি স্যারের শেখানো এই দোয়া পড়তে পড়তে প্রতিদিন কবরস্থানের পাশে দিয়ে নির্দ্বিধায় যাওয়া আসা করতাম। এখনো আমি অন্ধকার রাতে কোথাও গেলে এই দোয়া পড়ি।
মৌলানা স্যার শুধু মঈনপুর হাই স্কুলের শিক্ষক বা মসজিদের ইমামই ছিলেন না, তিনি অনেকটা পুরো গ্রামের অভিবাবক ছিলেন। গ্রামের কারো কোন সমস্যা হলেই মাওলানা সাহেবর কাছে হাজির হতো সমাধানের জন্য। গ্রামের বিভিন্ন মার দরবার এসবেরও মীমাংসা মাওলানা স্যার ছাড়া হতো না।
মাওলানা স্যার প্রতি রাতে ঘুমানোর পূর্বে রাত তিনটার সময় টেবিল ঘড়িতে এ্যালার্ম দিয়ে রাখতেন। ঘড়িতে এ্যালার্ম বাজার সাথে সাথে তিনি উঠে পুকুরে গিয়ে ওজু সম্পন্ন করে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। তারপর ফজরের নামাজের পর এক ঘন্টার মত কোরআন তেলাওয়াত করে রুমে এসে ঘন্টাখানেক ঘুমাতেন। প্রথম প্রথম আমিও উঠে পড়তাম। তিনি আমাকে বলতেন তুমি ঘুমাও ফজরের আজান হলে উঠবে। তবে স্যারের সকালের ঘুম প্রতিদিন সম্ভব হতো না। বিভিন্ন লোক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হাজির হতো।
স্যারের আরেকটা বৈশিষ্ট ছিলো তিনি কারো বাড়িতে দাওয়াত খেতে যেতেন না। অনেক অনুরোধ করেও কেউ দাওয়াত খাওয়াতে পারেনি। তবে একবার একটা দাওয়াত তিনি গ্রহণ করেছিলেন। মঈনপুর গ্রামের পশ্চিম পাড়ার সোনা উল্লা নামে একটা লোক নৌকা চালিয়ে তার জীবন জীবিকা নির্বাহ করতো। স্যার প্রায়ই স্কুলের কাজে সিলেট যেতেন এবং সোনা উল্লাহকে আগেই বলে রাখতেন যেনো সে নৌকা নিয়ে নদীর ঘাটে থাকে। সোনা উল্লাহ একদিন সকাল বেলা মসজিদে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সহিত বল্লো হুজুর আমার খুব ইচ্ছা আপনাকে একদিন আমি গরীবের ঘরে দুটো ডাল ভাত খাওয়াবার। আপনি যদি একটা তারিখ দেন তাহলে আমি খুশী হবো। স্যার তার দাওয়াতটা সাথে সাথেই গ্রহণ করলেন। একটা তারিখ নির্ধারন করে বল্লেন আমরা দুইজন যাবো। সোনা উল্লাহ খুশী মনে চলে যাবার পর অমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম আপনিতো কারো দাওয়াত গ্রহণ করেন না, তাহলে সোনা উল্লাহর দাওয়াত গ্রহণ করলেন কেনো? জবাবে স্যার বল্লেন সোনা উল্লাহ জানেনা যে আমি কোথাও দাওয়াত খেতে যাই না। জানলে হয়তো আসতোনা। আমি যদি তাকে ফিরিয়ে দেই সে ভাববে যে, সে অত্যন্ত গরীব বলে তাকে অবহেলা করে তার দাওয়াত গ্রহণ করিনি। তাই সে যাতে অসন্তুষ্ট না হয় এ জন্য তার দাওয়াত গ্রহণ করলাম।
স্যার কোন খতমে যেতেন না। তবে প্রতি শুক্রবার বা অন্যদিন লোকজন তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু টাকা দিতো। স্যার এই টাকা একটা নির্দিষ্ট থলের মধ্যে রাখতেন। আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম এই থলের মধ্যে এ টাকা কেনো রাখেন? স্যার বল্লেন আমি লিল্লাহর টাকা খাই না এবং আমার জন্য এটা জায়েজ নয়। লোকজনের দান করা এ টাকাটা আমি এ থলের মধ্যে রাখার এক মাস পর হিসাব করে দেখি কত টাকা জমেছে। এই টাকার সাথে আমার পকেট থেকে আরো কিছু টাকা যোগ করে এলাকার এক এক জন গরীব মানুষকে দান করি যাতে এই টাকাটা দিয়ে তার কিছুটা হলেও উপকার হয়।
মাওলানা স্যার মঈনপুর হাই স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি তার নিজ গ্রামে ঈদগাহ ও ঝিগলী হাই স্কুল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। প্রথমে এটা ছিলো ঝিগলী জুনিয়র হাই স্কুল। প্রথম অবস্থায় স্কুলে ছাত্র সংখ্যা ছিলো খুবই কম। সরকার কর্তৃক স্কুলের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ছাত্র স্কুলে ছিলো না। স্কুল পরিদর্শনের জন্য জেলা শিক্ষা অফিস থেকে স্কুল পরিদর্শক স্কুলে আসবেন। মাওলানা স্যার মঈনপুর হাই স্কুল থেকে ৬০/৭০ ছাত্র নিয়ে ঝিগলী স্কুলে নৌকা যোগে সকাল ১০ টার আগেই হাজির হয়ে এই ছাত্রদের নাম স্কুলের ক্লাশ সিক্স থেকে এইট পর্যন্ত রেজিষ্টারী খাতায় নাম লেখালেন। স্যার এসব ছাত্রদের আগেই বলে রেখেছিলেন অমুকদিন সকালে তোমরা আমার সাথে যেতে হবে। বর্ষাকাল ছিলো তাই আগে থেকেই নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছিলো। যথারিতি স্কুল পরিদর্শক এসে পরিদর্শন করে গেলেন এবং ঐ বছরই জুনিয়র হাই স্কুলের স্বীকৃতি পায়। ঐদিন পরিদর্শক বিদায়ের পর স্যারের ভাতিজা এবং ভাতগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব আবুল খয়ের সাহেব তার বাড়ীতে আমাদেরকে নিয়ে ভূরিভোজ করান।
মজার বিষয় হলো ৬০/৭০ জন ছাত্র অনুপস্থিত থাকায় তখনকার প্রধান শিক্ষক রিয়াছত আলী স্যারের বিষয়টি নজর এড়ায়নি। তিনি খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারলেন এবং ঐ দিন যতো ছাত্র অনুপস্থিত ছিলো তাদের সবাইকে আট আনা করে জরিমানা করা হয়। পরে মৌলানা স্যারের কাছ থেকে জরিমানার কথা শুনে আবুল খয়ের সাহেব সব ছাত্রকে জরিমানা প্রদানের জন্য এক টাকা করে দেন।
মৌলানা স্যার শুধুমাত্র একজন শিক্ষকই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক। সমাজের বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে তিনি সব সময় সামনে থেকে প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বাংলা, ইংরেজী, অারবী, উর্দূ ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বয়সের কারণে শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে তিনি স্কুল থেকে অবসর নেন। তার জায়গায় নিয়োগ দেওয়া হয় তারই সুযোগ্য সন্তান মৌলানা আবুল ফজলকে।
বিবাহিত জীবনে তিনি এক ছেলে ও দুই কন্যা সন্তানের জনক।
অত্যন্ত মার্জিত, বিনয়ী, নিরহংকারী এবং অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী এ মানুষটির দৈনন্দিন জীবন যাপন ছিলো অত্যন্ত সাদাসিদে।
১৯৮৫ সালের ৩১ অক্টোবর বার্ধক্য জনিত কারণে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে তার মা’বুদের কাছে চলে যান।
আল্লাহ তা’য়ালা যেনো তার প্রিয় বন্দাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে দেন – আমিন।
লেখক : এম এ হান্নান (ভাতগাঁও)
Helpline - +88 01719305766