৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ ০৫:০৫
আহমেদ হেলাল
লাল-সবুজের যে পতাকাটি আমরা পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরি, সেই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে কেউ ধর্ষণের ‘সেঞ্চুরি’র মহোৎসব করতে পারে—এমন কোনো গল্প পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশের ইতিহাসেই বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমাদের পোড়া কপাল! এই বাংলায় আমরা শুধু সেই বীভৎসতা দেখিনি, দেখেছি ক্ষমতার দম্ভে সেই নরপশুদের মিষ্টি বিতরণ করার দৃশ্যও।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগের কথা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা জসিমউদ্দিন মানিকের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এক ত্রাসের রাজত্ব। ১৯৯৮-৯৯ সালের সেই কালিমালিপ্ত অধ্যায়ে ১০০টি ধর্ষণের ‘কোটা’ পূর্ণ করার পর যখন ক্যাম্পাসে আনন্দের মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল, তখন থমকে গিয়েছিল গোটা দেশের বিবেক। তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে মানিকদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা হলেও, রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণে সেই ক্ষতের কোনো স্থায়ী এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার এই সমাজ পায়নি।
ক্ষমতার হাতবদল হয়, কিন্তু নারীনির্যাতনের চরিত্র বদলায় না। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম আরেক নারকীয় অধ্যায়। উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে গণধর্ষণের শিকার হলেন মা ও মেয়ে, গর্ভবতী নারীদের ওপর চলল অমানুষিক পাশবিকতা। চট্টগ্রামে আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মহররম আলী মুহুরীকে নৃশংসভাবে হত্যা করার পাশাপাশি বিরোধী পক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হলো নারীর শরীরকে। বিএনপি-জামায়াত আমলের সেই নারকীয়তা আজও বাংলার মানুষের স্মৃতিতে দগদগে ঘা হয়ে আছে।
ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশে যখনই যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তাদের একাংশ ক্ষমতাকে ধরে রাখার বা জাহির করার সবচেয়ে আদিম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে ধর্ষণকে। ২০০৬-এর পরবর্তী সময়ে এবং গত দেড় দশকে এই সংস্কৃতি যেন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল।
আমরা ভুলে যাইনি ২০১৬ সালের মার্চ মাসের সেই অন্ধকার রাতটির কথা। কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতর নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল। দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু এক দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত সিআইডি বা কোনো তদন্ত সংস্থা তনুর ধর্ষক ও খুনিদের চিহ্নিত করতে পারেনি। ক্ষমতার অদৃশ্য এক চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে সেই ফাইল। একইভাবে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে চলন্ত বাসে ডাকাত বা বখাটেদের দ্বারা নারীদের জিম্মি করে ধর্ষণের ঘটনা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার চরম নিরাপত্তাহীনতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
প্রশ্ন হলো, এই সব নির্মমতার শেষ কোথায়? কেন প্রতিটি ঘটনার পর কিছুদিন তীব্র আন্দোলন হয়, টকশো উত্তপ্ত হয়, আর তারপর এক ‘অদৃশ্য কারণে’ সব ধুলোর আবরণে ধামাচাপা পড়ে যায়?
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ধর্ষণের মামলায় সাজা হওয়ার হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। এই অবিশ্বাস্য বিচারহীনতার সংস্কৃতির মূল কারণ তিনটি:
১. রাজনৈতিক ঢাল: অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, স্থানীয় বা জাতীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় তারা পার পেয়ে যায়।
২. প্রশাসনের নির্লিপ্ততা ও প্রভাব: অর্থের দাপট এবং ক্ষমতার চাপে অনেক সময় পুলিশি তদন্ত দুর্বল করা হয়, আলামত নষ্ট করা হয়।
৩. দীর্ঘসূত্রতার কৌশল: একটি মামলার রায় হতে হতে যখন ১০-১৫ বছর কেটে যায়, ততদিনে জনস্মৃতি থেকে ঘটনাটি মুছে যায়। অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে বুক ফুলিয়ে ঘোরে।
আজ যদি অতীতে জাহাঙ্গীরনগরের মানিকদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ঝুলানো যেত, যদি ২০০১ সালের উত্তরবঙ্গের নির্যাতকদের কঠোরতম শাস্তি হতো, কিংবা তনুর খুনিদের ফাঁসি নিশ্চিত করা যেত—তবে আজ সমাজের কোনো কোণে ‘রামিশা’দের মতো নিষ্পাপ মেয়েদের এমন নির্মম পরিণতির শিকার হতে হতো না। এক একটি বিচারহীনতা সমাজে আরও দশটি নতুন অপরাধীর সাহস বাড়িয়ে দেয়।
রামিশাদের এই দীর্ঘশ্বাস আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার গালে একেকটি চপেটাঘাত। আমরা আর কতকাল এই ধুলোচাপা ইতিহাসের বোঝা বইব? রাজনীতি, ক্ষমতা আর দলের ঊর্ধ্বে উঠে যদি আজই এই ধর্ষক ও খুনিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা না করে, তবে এই লাল-সবুজ পতাকা আমাদের কোনোদিনই ক্ষমা করবে না। বিচার হোক প্রতিটি ধর্ষণের, অবসান ঘটুক এই চিরস্থায়ী অন্ধকারের।
Helpline - +88 01719305766