উন্নয়নের ‘উভয়চর’ বিপ্লব: দিরাই-জগন্নাথপুর রুটে এখন নৌকায় চাকা ঘোরে!

প্রকাশিত:সোমবার, ২০ এপ্রি ২০২৬ ০৪:০৪

উন্নয়নের ‘উভয়চর’ বিপ্লব: দিরাই-জগন্নাথপুর রুটে এখন নৌকায় চাকা ঘোরে!

Manual1 Ad Code

দিরাইয়ের চানপুর ও করিমপুর থেকে মাটিয়াপুর, কিংবা জগদল থেকে হলিমপুর—আপনি যদি মনে করেন এখানে যাতায়াতের জন্য ভালো রাস্তা খুঁজবেন, তবে আপনি ভিনগ্রহের প্রাণী। এই জনপদে রাস্তা হওয়ার কথা ছিল সেই ব্রিটিশ আমলে, কিন্তু আজ অবধি রাস্তার দেখা মেলেনি। তবে এলাকার মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি আর নেতাদের ‘সৃজনশীল’ মগজ মিলিয়ে যে যুগান্তকারী সমাধান বের হয়েছে, তা শুনে খোদ নাসার বিজ্ঞানীরাও গবেষণা ছেড়ে দিরাইয়ের ‘টানাখালি’ ঘাটে এসে বসে থাকতে পারেন।

​গত সপ্তাহে এক জনসভায় স্থানীয় নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, “রাস্তা হচ্ছে না বলে মন খারাপ করবেন না। আমরা এখন থেকে এলাকার সব নৌকায় চাকা লাগিয়ে সেগুলোকে ‘উভচর যান’ বা ‘হাইব্রিড ট্রান্সপোর্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলাম!”

Manual5 Ad Code

​পরদিন থেকেই দিরাই,জগদল-জগন্নাথপুর রুটে দেখা গেল মহাজাগতিক দৃশ্য। ঘাটে বাঁধা ডিঙি আর গয়না নৌকাগুলোতে লাগানো হয়েছে ভ্যান বা রিকশার চাকা। যখন বর্ষায় পানি থাকে, তখন লগি-বৈঠা চলে সপাৎ সপাৎ। আর যখন পানি নেমে কাদা বের হয়, তখন শুরু হয় আসল ‘অ্যাডভেঞ্চার’। মাঝিরা এখন নিজেদের ‘ক্যাপ্টেন’ না বলে ‘পাইলট’ বলছেন।

​টানাখালি,করিমপুর ও জগদল এর কাদায় যখন নৌকার চাকা দেবে যায়, তখন পাইলট চিৎকার করে বলেন, “সম্মানিত যাত্রীগণ, সিটবেল্ট শক্ত করে ধরুন। আমরা এখন জলপথ থেকে স্থলপথে প্রবেশ করছি। দয়া করে সবাই নিচে নেমে একটু ধাক্কা দিন, শরীরটা একটু জিম করা হয়ে যাবে!”

Manual2 Ad Code

​তবে এই এলাকার সবচেয়ে বড় পর্যটন আকর্ষণ হলো মোড়ে মোড়ে বসানো ‘প্রতিশ্রুতির ম্যুরাল’। যেহেতু গত ৫০ বছরেও রাস্তা হয়নি, তাই সেই খালি জায়গাগুলোতেই নেতাদের অমর সব বাণীর ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। অন্তত মানুষ এগুলো দেখে রক্তচাপ না বাড়িয়ে হাসতে পারে।​

Manual4 Ad Code

মাটিয়াপুর মোড়ের ম্যুরালে এক নেতার মূর্তির নিচে খোদাই করা— “আগামী কোরবানির আগে এখানে পিচ ঢালা রাস্তা না হলে আমি রাজনীতি ছেড়ে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা হব।” (বি:দ্র: নেতা সাহেব এখনো রাজনীতিতেই আছেন, তবে বাঁশি বাজাতে পারেন কি না জানা নেই)।​

করিমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোড়ে, এখানে এক বিশাল রঙিন ম্যুরালে লেখা— “এই এলাকাকে আমি সুইজারল্যান্ড বানিয়ে দেব।” ম্যুরালটির ঠিক নিচেই একটা মহিষ কর্দমাক্ত সুইজারল্যান্ডের স্বপ্নে পরম তৃপ্তিতে কাদার ভেতর গড়াগড়ি খাচ্ছে।​

জগদল-জগন্নাথপুর সংযোগস্থল : এক তরুণ নেতার ডিজিটাল ম্যুরাল। সেখানে লেখা— “ফ্লাইওভার হবে মাথার ওপর দিয়ে, নিচে চলবে পাতাল রেল।” মানুষ এখন কাদার মধ্যে নৌকা ঠেলতে ঠেলতে ওপরের দিকে তাকিয়ে পাতাল রেলের ‘অক্সিজেন’ খোঁজে।

​এখন এলাকার মানুষ আর রাস্তা হওয়ার কষ্টে কাঁদে না। বরং বিকেলের দিকে পর্যটকরা এই ম্যুরালগুলো দেখতে আসে। এক ম্যুরাল থেকে অন্য ম্যুরালে যাওয়ার জন্য ভাড়া পাওয়া যায় সেই বিখ্যাত ‘চাকাওয়ালা নৌকা’। হলিমপুরের এক মুরুব্বি দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “বাবা, রাস্তা দিয়ে কী হবে? রাস্তা দিয়ে তো শুধু গাড়ি চলে। আর আমাদের এই ম্যুরালগুলো দিয়ে তো বিনোদন চলে! পৃথিবীর কোথাও কি এমন লাইভ কমেডি শো আছে?”

​পুরো ব্যাপারটা এখন এমন এক ‘সুখকর’ পর্যায়ে ঠেকেছে যে, সরকার যদি ভুল করে কাল পিচ ঢালা রাস্তা বানিয়েও ফেলে, এলাকার মানুষ সেটা রুখে দিতে পারে। কারণ রাস্তা হলে তো আর নৌকায় চাকা লাগিয়ে ‘উভচর’ অভিযান চালানো যাবে না! আর সবচেয়ে বড় ভয়—রাস্তা হলে তো প্রিয় নেতাদের ওই হাসির ম্যুরালগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে।

​বিনোদনপ্রিয় এই হাওরবাসীর এখন একটাই স্লোগান:​

“রাস্তা নেই তো কী হয়েছে? আমাদের নৌকা এখন ডাঙ্গায় চলে, আর নেতাদের কথা ম্যুরালে হাসে!”

​তাই দিরাই-জগন্নাথপুর রুটে ভ্রমণের জন্য আজই আপনার নৌকায় চাকা লাগিয়ে নিন। মনে রাখবেন, এখানে উন্নয়ন মানে চাকার ঘূর্ণন নয়, উন্নয়ন মানে প্রতিশ্রুতির শৈল্পিক ম্যুরাল!

Manual8 Ad Code

হেলাল আহমেদ,চ্যাপ্টির হাওর থেকে ;;

আলোচক ও সমালোচক।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ