সোনালি ধানে ছেয়ে গেছে দিরাইয়ের বুক: তবে হাসছে ধান, কাঁদছে কৃষক!

প্রকাশিত:শনিবার, ১৮ এপ্রি ২০২৬ ০৬:০৪

সোনালি ধানে ছেয়ে গেছে দিরাইয়ের বুক: তবে হাসছে ধান, কাঁদছে কৃষক!

Manual8 Ad Code

হেলাল আহমেদ, দিরাই থেকে ::

প্রকৃতি যেন হলুদ রঙ ঢেলে দিয়েছে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার দিগন্তজোড়া হাওরগুলোতে। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই সোনালি ধানের ঢেউ। কালিকোটা, চ্যাপ্টি আর বরাম হাওরের বুক চিরে বইছে পাকা ধানের ম ম গন্ধ। আর মাত্র কয়েকটা দিন—এরপরই কাস্তে হাতে কৃষকের ‘জোরসে বলো হেইও’ শব্দে মুখরিত হওয়ার কথা ছিল মাঠ। কিন্তু হায়! প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের আড়ালে এখন লুকানো এক বুক হাহাকার। সোনালি ধানের হাসি এখন কৃষকের চোখে কষ্টের জল হয়ে নামছে।

Manual3 Ad Code

​আকাশ যখন দীর্ঘশ্বাসের নাম হাওরের কৃষকের কাছে আকাশ শুধু নীলিমা নয়, আকাশ এক আতঙ্কের নাম। দিরাইয়ের বরাম ও চ্যাপ্টির হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। মেঘের সামান্য আনাগোনা মানেই বুক ধক করে ওঠা। বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস আর অকাল বন্যার আশঙ্কায় দিন কাটছে নির্ঘুম। পাকা ধান জমিতে রেখে ঘরে ফেরা যেন এক জীবন্ত যন্ত্রণার নাম।

Manual4 Ad Code

 

কৃষকদের সেই চিরচেনা গান আজ যেন বিষাদ সিন্ধু হয়ে বাজছে— “সব ধান তো পাইক্যা গেছে, কাটবো কেমনে ভাই?”

​শ্রমিক সংকট: সোনার ধান যেন গলার কাঁটা
​মাঠে ধান আছে, কিন্তু কাটার মানুষ নেই। দিরাইয়ের ছোট-বড় প্রতিটি হাওরের বর্তমান চিত্র এটাই। যে শ্রমিকরা এক সময় দল বেঁধে আসত, তাদের এখন খুঁজে পাওয়াই দায়। আর যাও পাওয়া যাচ্ছে, তাদের মজুরি শুনলে মনে হয় ধান নয়, যেন হীরা কাটতে এসেছেন তারা!

​স্থানীয় কৃষকরা আক্ষেপ করে জানান, এক বিঘা জমির ধান কাটতে শ্রমিকরা এখন দাবি করছেন ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা। শুধু কি তাই? এই চড়া মূল্যেও মিলছে না পূর্ণ সেবা। তারা ধান কেটে শুধু জমিতেই ফেলে রাখবে। সেই ধান আঁটি বেঁধে খলায় নেওয়া কিংবা মাড়াই করার ঝক্কি সামলাতে কৃষককে গুণতে হবে আরও দ্বিগুণ খরচ।
​মালিক যখন মজুর, মজুর যখন মহাজন
​জমির মালিকদের দশা এখন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানোর’ মতো।

 

বরাম হাওরের এক প্রান্তিক কৃষক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,
​”বাবা, সারা বছর এই দিনটার আশায় থাকি। নিজের রক্ত পানি করে ধান ফলাইছি। এখন শ্রমিকের যা দাম, তাতে ধান ঘরে তোলার চেয়ে জমিতে পচে যাওয়াও যেন ভালো! ধান বিক্রি করে কি শ্রমিকের মজুরিই দিতে পারব?”

​টুইস্টটা এখানেই—এক সময় যারা জমির মালিক ছিলেন, শ্রমিক সংকটের এই যাঁতাকলে পড়ে আজ তারা নিজেরাই কাস্তে হাতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবু যেন কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। এক বিঘা ধানের পেছনে ৪০০০ টাকা খরচ করা মানে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলা।
​হাওরের হাহাকার বনাম সোনালি স্বপ্ন
​উপজেলার কালিকোটা হাওরের চিত্র আরও করুণ।

Manual3 Ad Code

 

বড় বড় গৃহস্থরা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটছেন শ্রমিকের সন্ধানে। কোথাও কোথাও উচ্চ মজুরির বিনিময়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এই যেন এক ‘মিষ্টি বিষ’! মাঠ ভরা ফসল আছে, কিন্তু ঘরে তোলার সাধ্য নেই।

Manual6 Ad Code

​দিরাইয়ের এই হাওরগুলোতে এখন শুধু পাকা ধানের দোলা নয়, দুলছে হাজারো কৃষকের ভাগ্য। বৈরী আবহাওয়া আর শ্রমিক সংকটের এই ‘মরণফাঁদ’ থেকে বাঁচতে কৃষকরা এখন কেবল সৃষ্টিকর্তার দয়া আর সরকারি সহযোহিতার প্রার্থনা করছেন। ধান যদি দ্রুত ঘরে না ওঠে, তবে সোনালি ফসলের এই উৎসব বিষাদে রূপ নিতে বেশি সময় লাগবে না।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ