১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রকাশিত:শুক্রবার, ২৪ জুলা ২০২৬ ০৮:০৭
ফয়সল আহমদ বাবুল:- বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, পরিবেশ প্রকৌশল ও গবেষণার অঙ্গন ২৪ জুলাই হারিয়েছে এক প্রজ্ঞাবান শিক্ষককে। হারিয়েছে এক নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও মানবিক ব্যক্তিত্বকে। তিনি ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং (সিইই) বিভাগের জ্যেষ্ঠতম অধ্যাপক। দেশের একজন বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। সিলেট নগরীর আখালিয়া লেকসিটিস্থ তাঁর বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর প্রয়াণে শুধু শাবিপ্রবি নয়, দেশের শিক্ষা, গবেষণা ও পরিবেশ আন্দোলনের অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।
অধ্যাপক ড. আখতারুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন দেশের পরিবেশ আন্দোলনের এক প্রজ্ঞাবান বিজ্ঞানী ও দূরদর্শী শিক্ষাবিদ। তিনি জ্ঞানচর্চাকে কখনো শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে আবদ্ধ রাখেননি। গবেষণাকে তিনি মানুষের কল্যাণ এবং জাতীয় উন্নয়নের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন। দেশের নদ-নদী, জলাভূমি, মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষাকে তিনি আজীবনের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাঁর গবেষণা ছিল যুগোপযোগী ও সুদূরপ্রসারী। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, পরিবেশ রক্ষা কোনো সাময়িক আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক একটি মৌলিক অধিকার। তাই পরিবেশগত প্রতিটি সংকট তিনি আবেগ নয়, যুক্তি, গবেষণা ও বাস্তব তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করতেন। তাঁর সুস্পষ্ট মতামত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং পরিবেশবিদদের জন্য ছিল নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশনা। পরিবেশ সংরক্ষণে বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান দেশের পরিবেশ গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।
বরাক নদীর ওপর প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বহুমুখী বাঁধ নিয়ে যখন বাংলাদেশে উদ্বেগ ও বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে, তখন অধ্যাপক ড. আখতারুল ইসলাম চৌধুরী বিষয়টিকে আবেগের পরিবর্তে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সেমিনার, গবেষণা সম্মেলন এবং গণমাধ্যমে তিনি তথ্য-উপাত্তের আলোকে দেখিয়েছিলেন, এই বাঁধ নির্মিত হলে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে হাওরাঞ্চলের বোরো ধান উৎপাদন, কৃষি অর্থনীতি এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর। তিনি সতর্ক করে বলেন, নদীর প্রবাহ কমে গেলে সুপেয় পানির সংকট, লবণাক্ততার বিস্তার এবং হাওরের জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি ঘটতে পারে। একই সঙ্গে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বৃহৎ জলাধার নির্মাণের সম্ভাব্য ভূ-তাত্ত্বিক ঝুঁকিও তিনি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি কেবল সংকট চিহ্নিত করেই থেমে থাকেননি। সমাধানের বাস্তবসম্মত পথও নির্দেশ করেছেন। আন্তর্জাতিক নদী আইনের ভিত্তিতে যৌথ পানি ব্যবস্থাপনার পক্ষে মত দেন। সমন্বিত হাইড্রোলজিক্যাল সমীক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একতরফা পানি প্রত্যাহার বন্ধে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন। টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুতে তাঁর তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ, সুস্পষ্ট অবস্থান এবং দূরদর্শী মতামত সে সময় গণমাধ্যম, গবেষক সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ১৯৯০ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের আগেই তিনি গবেষণায় অসামান্য মেধার পরিচয় দেন। ১৯৮৮ সালে ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সম্মাননা লাভ তাঁর গবেষণামনস্ক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। পরবর্তীকালে বেলজিয়ামের ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব ল্যুভেন ( কেইউএল) ও ফ্রি ইউনিভার্সিটি অব ব্রাসেলস (ভিইউবি) থেকে ওয়াটার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। নেদারল্যান্ডসের ডেলফটে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইএইচই থেকে স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং পরে পরিবেশ প্রকৌশলে পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে একজন দক্ষ পরিবেশ প্রকৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার কদুরখীল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে ১৯৬০ সালের ৪ মে জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর পিতা মরহুম আব্দুল জব্বার চৌধুরী এবং মাতা ্মরহুমা সখিনা খাতুন। শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি (বিজ্ঞান) এবং ১৯৭৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি (বিজ্ঞান) উত্তীর্ণ হন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুবর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশে ফিরে আসেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের উন্নয়নের জন্য দেশের মেধাবীদের দেশের মাটিতেই কাজ করা উচিত। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রতিষ্ঠালগ্নে যুক্ত হন এবং ১৯৯৬ সালে বিভাগটির প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নবীন একটি বিভাগকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা, আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি এবং দক্ষ প্রকৌশলী তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও কয়েক দফা সিইই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া স্কুল অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজির ডিন হিসেবেও সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে তিনি ২০২৪ সালের ৩ মে শাবিপ্রবির অধ্যাপনা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অধ্যাপক আক্তার চৌধুরীর গবেষণার বিস্তৃতি ছিল অসাধারণ। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর পরিবেশ, পানি দূষণ, সুরমা নদীর পানির গুণগত মান, আর্সেনিক দূষণ, ভূমিকম্প ঝুঁকি, শিল্পবর্জ্য শোধন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আরবান হিট আইল্যান্ডের মতো সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও গবেষকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র। তাঁর রচিত মিউনিসিপাল সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রন্থটি বাংলাদেশের পরিবেশ প্রকৌশল শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য জার্নালে তাঁর ৬৫টি গবেষণা নিবন্ধ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৮৬টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যা তাঁর গবেষণা জীবনের ব্যাপ্তি ও গভীরতার সাক্ষ্য বহন করে।
গবেষণার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী। টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের গঠিত জাতীয় বৈজ্ঞানিক সংস্থার আহ্বায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব পরিবেশবিদদের কাছে আজও প্রশংসিত। একইভাবে কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম ( সিডিএমপি)-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে তিনি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আন্তর্জাতিক ওয়াটার সাপ্লাই অ্যাসোসিয়েশন (আইডব্লিউএসএ), আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স (এএসসিই), আমেরিকান ওয়াটার ওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশন (এডব্লিউডব্লিউএ) এবং আমেরিকান কনক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই)-এর সদস্য হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক ড. আখতারুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সৌম্য ও প্রচারবিমুখ। তিনি কখনো প্রচারের আলো খুঁজে বেড়াননি; বরং নীরবে গবেষণা করে দেশের নদী, হাওর ও পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী আন্দোলনের সময় আমার পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সূত্রে তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি অকৃপণভাবে পরামর্শ দিতেন এবং জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয়কে সাধারণ মানুষের ভাষায় উপস্থাপনের কৌশল শেখাতেন। যা তাঁর আন্তরিকতা, উদারতা ও স্নেহময় ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল পরিচয় বহন করে। তাঁর সঙ্গে গড়ে ওঠা সেই সম্পর্ক আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। সিলেটের পরিবেশ আন্দোলন, নদী ও হাওর রক্ষার সংগ্রাম এবং দেশের ন্যায্য জলনীতি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে অধ্যাপক ড. আখতারুল ইসলাম চৌধুরীর নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তাঁর কর্ম, গবেষণা ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনিঃশেষ প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পরিবেশ বিজ্ঞান ও নদী সুরক্ষায় তাঁর অবদান সিলেট ও বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে আমরা গভীর শোকাহত। আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই জ্ঞানতাপসকে। তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবু তাঁর জীবন আমাদের আশাবাদী করে। কারণ তিনি দেখিয়ে গেছেন, নিষ্ঠা, সততা, জ্ঞানচর্চা এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত কর্মই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে অমর করে তোলে।
মৃত্যুকালে অধ্যাপক ড. আক্তারুল ইসলাম চৌধুরী স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক পুত্র রেখে গেছেন। তাঁর সহধর্মিণী শেখ নার্গিস সুলতানা সিলেটের রাগীব-রাবেয়া ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। কনিষ্ঠা কন্যা সিলেটের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে বর্তমানে ইন্টার্নশিপ করছেন। একমাত্র পুত্র চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন। দেশের কল্যাণে নিবেদিত তাঁর সৎকর্মগুলো কবুল করেন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী ও অগণিত শিক্ষার্থীকে এই অপূরণীয় শোক সইবার শক্তি দান করেন। আমিন।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
Helpline - +88 01719305766