পাথরের সঙ্গে লুট হয়ে গেল শাহ আরেফিন টিলাও

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ১৯ আগ ২০২৫ ১২:০৮

পাথরের সঙ্গে লুট হয়ে গেল শাহ আরেফিন টিলাও

Manual4 Ad Code
সুরমাভিউ:-  সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা ধ্বংসের পেছনে স্থানীয় ২৬ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ চক্রে রয়েছেন বিএনপি, আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশে টিলাটি বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

টিলার কিছু অংশ ধ্বংস করে পাথর উত্তোলনের পর কেবল হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানাসহ একাংশ অক্ষত ছিল। স্থানটিকে কেন্দ্র করে অবশিষ্ট ছিল কিছু গাছ ও বড় আকারের কয়েক হাজার সংরক্ষিত পাথর। এক বছরে শুধু শাহ আরেফিনের (রহ.) আস্তানাই নয়, পুরো টিলা ও পাশের মসজিদ-কবরস্থানের জায়গাও ধ্বংস করে পাথর উত্তোলন করেছে পাথরখেকোরা। ফলে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে জড়িত জায়গাটিতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

সম্প্রতি পাথর নিয়ে হইচই শুরু হলে অভিযানে নামে যৌথ বাহিনী। সে সুযোগে তিন দিন ধরে টিলা ধ্বংস করে পাথর উত্তোলন থেকে সরে দাঁড়ায় পাথরখেকোরা। তাদের লক্ষ্য ছিল টিলা এলাকার অবশিষ্ট মসজিদ ও কবরস্থানে জায়গা ধ্বংস করে পাথর উত্তোলন করা। কিন্তু প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে তারা সরে দাঁড়ায়– এমন তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা।

সোমবার সরেজমিন একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এত অভিযান ও পাথর উদ্ধারের পরও শাহ আরেফিন টিলা এলাকা থেকে এখনও যন্ত্রপাতি সরায়নি পাথরখেকোরা। গত দুই দিনে কেউ কেউ সরিয়ে নিলেও অনেকে অপেক্ষায় আছেন আবার পাথর উত্তোলনের। গতকাল বিকেলে চার শ্রমিককে একটি গর্ত থেকে মেশিন সরিয়ে নিতে দেখা গেল। তারা মালিকের নাম বলতে চাননি। বিভিন্ন গর্তে পাইপ ও পাথর উত্তোলন যন্ত্র দেখা গেছে।

Manual1 Ad Code

শাবল আর খুন্তির আঘাতে এক বছরে ১৩৬ একরের শাহ আরেফিন টিলার অবশিষ্ট অংশ এখন বিরান ভূমি। এখন সেখানে টিলা বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। স্থানে স্থানে পুকুরসম গর্ত। টিলার ভেতরে একাধিক রাস্তা করা হয়েছে পাথর বহনের জন্য। পুরো টিলা এলাকায় এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে দেখলে মনে হবে কেউ বোমা ফেলেছে। সীমান্তঘেঁষা টিলাটির পাদদেশের পানি একসময় স্থানীয় সূর্যখাল হয়ে সোনাই নদীতে গিয়ে পড়ত। সেই খালটি ভরাট হয়ে গেছে পাথর উত্তোলনের বালু ও মাটিতে।

স্থানীয় চিকাডহর, জালিয়ারপাড়, মটিয়া টিলা শাহ আরেফিন টিলাটি ঘিরে রাখলেও এখন সব একাকার। ছনবাড়ির বাসিন্দা আব্দুন নুর নামের এক যুবক জানান, তিন দিন ধরে পাথর উত্তোলন বন্ধ আছে। টিলার তো আর অবশিষ্ট কিছু নেই। কোটি কোটি টাকার পাথর সেখান থেকে দিনরাত উত্তোলন করে বিক্রি করা হয়েছে।

Manual7 Ad Code

শাহ আরেফিন টিলা ও পাথর কোয়ারি
বিখ্যাত দরবেশ হজরত শাহ আরেফিন (রহ.) থেকে টিলার নামকরণ হয়েছে শাহ আরেফিন। তিনি কোম্পানীগঞ্জের চিকাডহর মৌজার ওই টিলায় কয়েকশ বছর আগে আস্তানা গেড়েছিলেন। সেখানে তিনি মাঝেমধ্যেই বসতেন। পরে ওই স্থানে স্থাপনা গড়ে তোলেন ভক্তরা। বড় আকারের কালো রঙের পাথর দিয়ে সেখানে সীমানা গড়ে তোলা হয়। পরে ওই আস্তানায় ওরসও হতো, যেখানে সারাদেশ থেকে জড়ো হতেন শাহ আরেফিনের (রহ.) ভক্তরা।

Manual4 Ad Code

১৯৯৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই এলাকায় আরেফিন পাথর কোয়ারি চালু করে। তিনবার ইজারা দেওয়ার পর শাহ আরেফিন টিলার অস্তিত্ব রক্ষায় গেজেট থেকে কোয়ারি বাদ দেওয়া হয়। ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত থেমে থেমে ধ্বংসযজ্ঞ চলে আরেফিন টিলা ও সেখানকার পাথর কোয়ারিতে। অবশিষ্ট থাকে দরবেশের আস্তানা এলাকা, মসজিদ, খেলার মাঠ ও কবরস্থান। কিন্তু গত এক বছরে আস্তানাসহ পুরো টিলাই ধ্বংস করা হয়েছে।

১৩৭ একর জায়গার মধ্যে ১০ একর ছিল মাজার, তথা আস্তানার ওয়াক্‌ফকৃত জায়গা। বাকি অংশ সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। কোয়ারি তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়লে পুরো ওয়াক্‌ফের জায়গা ছাড়া বাকি অংশ চলে যায় খাস খতিয়ানে। পাথর কোয়ারি এলাকা ধ্বংসের অভিযোগে ২০০৯ সালের ১১ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্ষতি নির্ধারণী টিম তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে ১৩৭ দশমিক ৫০ একরের টিলাকে ‘মরা কঙ্কাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এখন মসজিদ ও কবরস্থানের অংশবিশেষ ছাড়া সব এলাকাই ধ্বংস করা হয়েছে। সরকার কঠোর না হলে সেটিও বিলীন করে ফেলত তারা।

টিলায় ধ্বংসে ২৬ সদস্যের চক্র
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখান থেকে পাথর লুট করতেন। ৫ আগস্টের পর নতুন করে টিলা কেটে পাথর উত্তোলন শুরু করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি নেতাকর্মীসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় জালিয়ারপাড়ের বাসিন্দা ও মাজারের সাবেক খাদিমের ছেলে মনির মিয়া, ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি ফয়জুর রহমান, পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেবুল আহমেদ, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজির উদ্দিন, উপজেলা তাঁতী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইসমাইল আলী, তাঁর ভাই ইব্রাহিম মিয়া, জামায়াতের ইয়াকুব আলী ও যুবদল নেতা বাবুল আহমদ।

Manual8 Ad Code

চক্রে আরও আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক হুশিয়ার আলী, শাহ আরেফিন ওয়াক্ফ এস্টেটের সাবেক মোতাওয়ালি আনোয়ার হোসেন আনাই, জালিয়ারপাড়ের কালা মিয়া, চিকাডহর গ্রামের শাহীন মিয়া, আব্দুর রশিদ, আইয়ুব আলী, আব্দুল কুদ্দুছ, বাবুলনগরের সোনা মিয়া, বাহাদুরপুরের রতন মিয়া, জালিয়ারপাড়ের হোসেন মিয়া, আওয়ামী লীগের বশর মিয়া (বশর কোম্পানি), জালিয়ারপাড়ের বাশির মিয়া ও আব্দুন নুর। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে টিলা কেটে পাথর লুট করা হয়। গত এক বছরে প্রতিদিন ২০-৪০টি ট্রাক পাথর সেখান থেকে বিক্রি করা হয়েছে।

আরেফিন ওয়াক্‌ফ এস্টেটের সাবেক মোতাওয়ালি আনোয়ার হোসেন আনাই জানান, তিনি শুরু থেকে মাজার, কবরস্থান ও মাঠ রক্ষার আন্দোলন করেছেন। পাথর উত্তোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই। বশর মিয়া বলেন, দলের মানুষ তাঁর বদনাম করছে। তিনি হালচাষ করেন। পাথর উত্তোলনে জড়িত নন। ইসমাইল আলী বলেন, আমি ব্যবসায়ী মানুষ। শ্রমিকরাই লুটপাট করেছে। আরেফিনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি উজায়ের আল মাহমুদ আদনান বলেন, আরেফিন টিলায় অভিযান ও সেখানকার পাথর লুট রোধ করতে গিয়ে চারবার পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে। বর্তমানে উত্তোলন বন্ধ আছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার জানান, এক বছরে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক অভিযান করা হয়েছে আরেফিন টিলায়। কিন্তু টিলাটি রক্ষা করা যায়নি। আগে মামলাও হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ