সুরমাভিউ:- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গনিপুর গ্রামের এক গৃহবধু বিষপানে আত্নহত্যার খবর পাওয়া যায়। পৌরসভাস্ত ৯ নং ওয়ার্ডের গনিপুর গ্রামের মৃত সুরুজ মিয়ার ছেলে শাহাবুদ্দিনের প্রথম স্ত্রী তালাকের পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন হেপী বেগমকে। হেপী বেগম কে নিয়ে সুখেই ঘর সংসার চলছিল শাহাব উদ্দিনের। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর পুনরায় প্রথম স্ত্রী সেলিনা বেগম ফিরে আসে সংসারে। তখন থেকে শুরু হয় সতীন পরিবারে পারিবারিক কলহ। এক পর্যায়ে স্বামী শাহাব উদ্দিন, স্ত্রী হেপী বেগমকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। অসহ্য যন্ত্রণায় হেপী বেগম বিষ পান করে আত্মহত্যা করে। কিন্তু মেয়ের পরিবারের দাবি জোরপূর্বক বিষপান করিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওইদিন হেপী বেগমের পিতা মোশাহিদ আলী বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
ঘটনা ঘটেছে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল অনুমান সাড়ে ৮টায় সুনামগঞ্জ পৌরশহরের গনিপুর গ্রামে।
অভিযোগের বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের জুন মাসে সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের হবতপুর গ্রামের বাসিন্দা মুজাহিদ আলীর ৪ মেয়ে ও ১ ছেলের মধ্যে বড় মেয়ের হেপী বেগমের বিয়ে হয় সুনামগঞ্জ পৌরশহরের গনিপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত সুরুজ মিয়ার ছেলে শাহাব উদ্দিনের সাথে।
এই বিয়ের আগে শাহাব উদ্দিন আরেকটি বিয়ে করেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের বড়কাপন গ্রামের সেলিনা বেগমকে। তাকে তালাক দেওয়ার পর হবতপুর গ্রামে এই দ্বিতীয় বিয়ে করেন শাহাব উদ্দিন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর হেপী বেগম সুখ-শান্তিতে বসবাস করে আসছিলেন পরিবারে। দীর্ঘ দুই বছর পর ঘটনার ছয় মাস আগে হঠাৎ হেপী বেগমের সংসারে হাজির হয় তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী সেলিনা বেগম। দানা বাধতে শুরু হয় হিংসা, বিদ্বেষ ও পারিবারিক কলহের। আলাদা ঘরে বসবাস দুই স্ত্রীর। অবশ্য স্বামী শাহাব উদ্দিন থাকেন স্ত্রী হেপী বেগমের ঘরে। ঘটনার প্রায় ২০ দিন আগে গনিপুর গ্রামের গ্রাম্য সালিশে সতীনের সংসার মিলেমিশে চলার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। উভয় স্ত্রীর ঘরে স্বামী শাহাব উদ্দিনকে থাকারও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি হেপী বেগম।
ঘটনার দিন রাতে হেপী বেগমকে বেদড়ক মারপিট করে স্বামী শাহাব উদ্দিন, স্ত্রী সেলিনা বেগম, সেলিনার পুত্র শামসুল আলম জয় (১৮), শাহীন আলম শান্ত (১৬)। সকালে বিষপানে আত্মহত্যা করে হেপী বেগম। কিন্তু মেয়ের পরিবারের লোকজনের দাবি বিষ পান করিয়ে হেপী বেগমকে হত্যা করা হয়েছে।
হেপীর পরিবারের লোকজন জানান, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৮টায় স্বামী শাহাব উদ্দিন মোবাইল ফোন করে পাশের ঘরের নিজাম উদ্দিনকে জানান হেপী বেগম বিষপান করেছে। এই খবর পেয়ে পিতা মোশাহিদ আলী, প্রতিবেশি রিয়াজ উদ্দিন ও সাইফুর রহমানকে নিয়ে হবতপুর থেকে দ্রুত শহরের গনিপুর গ্রামে চলে আসেন।
হেপী বেগমের পিতা মুজাহিদ আলী জানান, তিনি খবর পেয়ে দ্রুত শাহাব উদ্দিনের বাড়িতে পৌঁছেন। ঘরের বাইরে থাকতে শুনতে পান হেপীকে শাহাব উদ্দিন বলছেন, পানি খেয়ে মর। পানি খা। এই কথা শুনতে শুনতে ঘরের ভেতরে পৌঁছেন হেপীর বাবা মুজাহিদ আলী ও অন্যরা।
তিনি বলেন, বিষ যখন খেয়েছে, হাসপাতালে নিয়ে যাও। তখন স্বামী শাহাব উদ্দিন বলেন, আমি পারবো না। পরে পিতার কাঁধে করে মেয়ে হেপীকে দীর্ঘ সাঁকো পার হয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষনা করেন। পরে লাশ ময়না তদন্ত করা হয়। ওইদিন মেয়ের পিতা মোশাহিদ আলী বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে হবতপুর গ্রামে হেপীর পরিবারের সাথে আলাপের পর গনিপুর গ্রামে এসে দেখা যায়, গনিপুর মেইন সড়ক থেকে সাঁকো পাড় হয়ে যেতে হয় শাহাব উদ্দিনের আলগা বাড়িতে। আশপাশে অন্তত একশ’ গজের মধ্যে কোনো বাড়িঘর নেই। এই বাড়িতে দুইটি ঘর রয়েছে। একটি ঘরে বসবাস করতো হেপী বেগম ও স্বামী শাহাব উদ্দিন, অপরটিতে সতীন সেলিনা বেগম, দুই পুত্র ও শ্বাশুড়ি। বর্তমানে অভিযুক্তরা পলাতক আছেন। ঘরগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। নিরব নিস্তদ্ধ এলাকা। এ সময় গ্রামের অনেকের সাথে ঘটনার বিষয়ে জানতে কথা হয়। কিন্তু কেউ কিছু বলতেও নারাজ।
মামলার তদন্তকারী অফিসার এস আই শফিকুল ইসলাম বলেন, বিষপানে মৃত হেপী বেগমের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করেছেন এস আই তুরণ। পরে ময়না তদন্ত হয়। আমি গণিপুরে গিয়েছিলাম। কিন্তু আসামী পক্ষের কাউকে পাইনি। স্থানীয়রাও এই ঘটনার বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে চাননি। মামলা তদন্তাধিন আছে।
সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, হেপী বেগম বিষপান করেছে, এটাতো আত্মহত্যা। মামলা হবে কেন। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট হয়েছে। ময়নাতদন্ত হয়েছে। ময়না তদন্ত রিপোর্ট আসলে পরে বুঝা যাবে।