শতবর্ষী অন্ধ আব্দুর রহমান বাঁশ ও দড়ি বেয়ে যান মসজিদ

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪ ১০:০৫

শতবর্ষী অন্ধ আব্দুর রহমান বাঁশ ও দড়ি বেয়ে যান মসজিদ

নাম আব্দুর রহমান মোল্লা। বয়স ১১৫ বছর। বয়সের ভারে কাঁপা গলায় কথা বললেও মসজিদের মাইকে আজান দেয়ার সময় সেই আজানের ধ্বনিতে খুঁজে পাওয়া যায় না তার আসল বয়সটা। লাঠির মাধ্যমে পথ খুঁজে নেয়া দৃষ্টিহীন আব্দুর রহমান নিয়মিত আজান ও নামাজ মসজিদে আদায় করেন। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত বাঁশ বেঁধে ও দড়ি টেনে নেন তিনি। এরপর সে বাঁশ ও দড়ি ধরে ধরে ও বেয়ে বেয়ে মসজিদে যান। মাইকে আজান দেয়ার পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতিও করেন। এভাবেই চলছে দীর্ঘ ১৩ বছর।
আব্দুর রহমান নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের সবচাইতে প্রবীণ ব্যক্তি। প্রায় ১৯ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তিনি তার দুই চোখের দৃষ্টি হারান। তার পরিবারে রয়েছে দুই স্ত্রী ও ২৫ জন ছেলে-মেয়ে।

তাদের মধ্যে ৬ সন্তান মারা গেছে এবং বর্তমানে তার ১০ মেয়ে, ৯ ছেলে ও দুই স্ত্রী বেঁচে রয়েছেন। সকল সন্তানদেরই প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। তাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শিক্ষক, কৃষি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, সৈনিক, ব্যবসায়ী এবং কৃষক রয়েছে। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ২০১১ সালে তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করেন। হজ পালন করে আসার পর নিজ গ্রামে নিজস্ব পাঁচ শতাংশ জমির ওপর তিনি তৈরি করেন একটি পাকা মসজিদ। ছেলে-নাতিন, আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামের মানুষদের নিয়ে ওই মসজিদে নামাজ আদায় শুরু করেন।
ছেলে আলহাজ মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল (মাস্টার) বলেন, ২০০৫ সালে একটি দুর্ঘটনায় আমার বাবা অন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫ বছর বিভিন্ন জায়গায় বাবাকে চিকিৎসা করানোর পরেও বাবার চোখে আলো ফিরিয়ে আনতে পারিনি। পরে ২০১১ সালে হজ পালন শেষে বাবা গ্রামেই একটি মসজিদ স্থাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বসতবাড়ি থেকে ২০০ মিটার দূরে নিজস্ব জমিতে মসজিদ স্থাপন করার পর সেখানেই বাবা মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সেখানেই আদায় করেন। বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে বাড়ি থেকে বাঁশ ও দড়ি টেনে দেয়া হয় মসজিদ পর্যন্ত। প্রথমে প্রায় ১৫ দিন ছেলে ও নাতিরা বাঁশ ও দড়ি দেখিয়ে দিয়ে মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন তাকে। পরে বাঁশ কিংবা দড়ি খুঁজে পাওয়ার জন্য হাতে একটি লাঠিও দেয়া হয়। তারপর থেকে তিনি নিজেই রাস্তা পার হয়ে বাঁশ ও দড়ি বেয়ে মসজিদে নিয়মিত যাতায়াত করে আসছেন।

আরেক ছেলে রফিকুল ইসলাম (মাস্টার) বলেন, বাবার বয়স চলছে ১১৫ বছর। এই বয়সে এসেও অন্ধ হয়ে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেন এবং নামাজ আদায় করেন। বাবার এমন মহৎ কাজে আমরা পরিবারের সকলেই অনেক খুশি। আমরা সকল ভাই-বোন বাবাকে নেয়ে গর্ববোধ করি।
দৃষ্টিহীন মুয়াজ্জিন আলহাজ মো. আব্দুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘মহান আল্লাহপাক আমাকে এখনো অনেক সুস্থ ও স্বাভাবিক রেখেছেন। মহান আল্লাহ আমার ইচ্ছে পূরণ করেছেন।’ তিনি জানান, বাঁশ ও দড়ি বেয়ে মসজিদে যেতে তার খারাপ লাগে না। যদিও রাস্তা পারাপারের সময় ঝুঁকি থাকে তারপরেও তিনি বিশ্বাস করেন আল্লাহ তাকে হেফাজতেই তার গন্তব্যে পৌঁছে দেবেন। বাকি জীবন তিনি এভাবেই ইসলামের পথে থেকেই মৃত্যুবরণ করতে চান। তিনি সকল মুসলমানদের নামাজের দাওয়াতও দিয়েছেন।

 

নগর ইউপি চেয়ারম্যান শামসুজ্জোহা সাহেব জানান, আব্দুর রহমান মোল্লা ১১৫ বছর বয়সে এসে এবং অন্ধ হিসেবে প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তার মানসিক দৃষ্টি সচল ও মনোবল দৃঢ় রেখেছেন তাতে মহান আল্লাহপাকের অশেষ ও বিশেষ কৃপা রয়েছে। তার এই অদম শক্তি দেখে এবং তা উপলব্ধি করে অনেকেই ইসলামী জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত হবে নিশ্চয়ই।