তিন বছরে ৪২ জন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন দেখে নিউরোসার্জন যা বললেন : মঈনুল হক মঈন

প্রকাশিত:বুধবার, ২৭ মার্চ ২০২৪ ১২:০৩

তিন বছরে ৪২ জন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন দেখে নিউরোসার্জন যা বললেন : মঈনুল হক মঈন

সুরমাভিউ:-  আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগের কথা। আমার সন্তানের কোমরে চিন-চিন পেইন, মাঝে-মধ্যে কোমর থেকে হাটু পযন্ত ক্রমান্নয়ে যায় সেই পেইনটি। বাচ্চার বয়স তখন ১৬ বছর। সিলেটে এক বছরে প্রায় কুড়ি জন ডাক্তার দেখালাম। ভারতীয় একজন ডাক্তারকেও দেখালাম, যিনি সিলেটে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে একদিন রোগী দেখেছিলেন। তিনি ফিসটা রেখে ভারতীয় একজন ডাক্তারের কাছে রেফার করেন।

সিলেটে ‘রোগটি চিনতে পারলাম না’ সব ডাক্তার একই কথা বলেন। তারা প্রতেকেই আবার ফিসটা রেখে রেফার করেন অন্য ডাক্তারের কাছে। রোগ হওয়ার এক বছর পর জনৈক ডাক্তারের চেম্বার থেকে আমার স্ত্রী মোবাইলে কল করে কেঁদে কেঁদে বলেন, আমাদের সব’নাশ হয়ে গেছে।

আমি ভাবলেশহীন মানুষ। ছিলাম ছাপার বেবসায়ী। কোন বিষয়ে বেশি ভাবতাম না। তার কান্নার মাঝে যা বুঝলাম, আজ রোগ ধরা পড়েছে। টেস্ট করায় ১৬ হাজার টাকা লেগেছে। সোবহানীঘাটস্হ ইবনে সিনার ডাক্তার বলেছেন, বাংলাদেশে শুধুমাত্র ঢাকার এক জায়গায় হয় অপারেশন হয়। ইন্সপাইনাল কড অথাত পীঠের হাড্ডি অপারেশন করে একটি পদার্থ বের করে ফেলে দিতে হবে। তবে উন্নত কোন দেশে করালে ভালো হবে।

তারপর ইবনে সিনার ডাক্তারের বণনাকৃত বাংলাদেশের অপারেশনের স্হান ঢাকার একমাত্র নিউরোসাইন্স হাসপাতালে চারজন মিলে যাই। ডাক্তাররা শুধুমাত্র সিলেট ইবনে সিনার একটি টেস্টের কাগজ দেখলেন। তারপর তাদের মূল্যবান সময়টা খরচ না করেই বললেন যে, এখানে ভতি হয়ে অন্তত ১৫/১৬ দিন অপেক্ষা করতে হবে। তারপর অপারেশন। খরচের কথা জানতে চাইলাম। তারা বললেন, যেহেতু হাসপাতালটি সরকারি, সেহেতু অপারেশনের কোন খরচ লাগবে না। শুধুমাত্র ৬/৭ লাখ টাকার ঔষধ পত্র লাগবে। আমাদের পক্ষে এতদিন থাকাটা অসম্ভব।

আমরা আবারও সিলেট চলে এলাম। ভাবতে লাগলাম কি করা যায়। ইবনে সিনার ডাক্তারের সাথে আবার যোগাযোগ করি। তাকে জিজ্ঞেস করি, সবস্ব বিলিয়ে আমরা না হয় অপারেশন করলাম। পুরোপুরি ভালো হবে তো। ডাক্তার বললেন, কোন উন্নত দেশে করালে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর আমাদের দেশে করালে ৫০% সম্ভাবনা ভালো হওয়ার। এত টাকা খরচ করে ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা আবার নেই।

ইবনেসিনার ডাক্তার বললেন, ২ মাসের মধ্যে চিকিৎসা না করালে পা-টি বেন্ড হয়ে যাবে। কিন্তু অপারেশন করার পরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।

তারপর আমরা গেলাম প্রতি মাসে ১ দিন রোগী দেখেন, সাউথ সুরমা নথ’ ইস্ট হাসপাতালে এমন একজন নিউরো সাজনের কাছে। ডাক্তার ভরসা দিলেন যে তিনি অপারেশন করলে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৯৫%। তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন ইবনে সিনার রিপোর্ট দেখে। তাকে দিতে হবে ৬ লাখ। বাকী আনুষাঙ্গিক আরো ২ লাখ টাকা। আমরা প্রস্তুতি নিয়েও ঐ দিন আর অপারেশন করা হলো না। পরবর্তী মাসে যখন আসবেন তখন করা হবে।

আমরা যোগাযোগ করি দিল্লির নামকরা একটি হাসপাতালে। তারা অফার করেন সবমোট বাংলাদেশী ১৫ লাখ টাকায় পুরো অপারেশন করে দেবেন। নিউরোসার্জনের ছবি ও যাবতীয় কাগজ পাঠানো হয় আমার ই-মেইলে। আমরা পাসপোর্ট সহ আনুষাঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করি।

ইতিমধ্যে আমরা ডাঃ জামুরানো নামক একজন ভালো মহিলা ডাক্তারের সন্ধান পাই। আমেরিকার মিশিগানের বিখ্যাত একজন বিখ্যাত নিউরোসার্জন তার সাথে যোগাযোগ করি। তিনির হিসাবে বাংলাদেশী প্রায় ১৬ লাখ টাকা অপারেশনের খরচ। তিনি তার পিএস ডিনাইস বাসেলের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তিনিও একজন মহিলা ডাক্তার। আর আমার মেনেজার দিলোয়ার ভাই ছিলেন লন্ডন থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক ডিগ্রিধারী। তাই আমার যোগাযোগে কোন সমস্যা হয়নি।

যোগাযোগের এক পযার্য়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেই নিউরোসার্জন ডাঃ জামুরানোর কাছে যাওয়ার। কিছু আত্মীয় স্বজনরাও সাহস দেন। ডিনাইস বাসেল ভিসার পাওয়ার জন্য যাবতীয় কাগজপত্র দেন। এরপর আমেরিকান দূতাবাসের এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ভিসার জন্য আবেদন করি। কিন্তু তারপরও ভিসার আবেদন রিফিউজ হয়।

দুই মাসে পা পঙ্গু হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে চলে গেছে তিন বছর। শুধু পায়ে মাঝে মধ্যে সমস্যা করে। সাহস আমাদের অনেকটা বেড়ে গেল। এরই মধ্যে খবর পেলাম ঢাকা নিউরোসাইন্স হাসপাতালের এক সিলেটি ডাক্তার মাসে একদিন রোগী দেখেন সোবহানীঘাটে। ইবনে সিনা পয়েন্ট আর উপশহর পয়েন্টের মধ্যিখানের একটি ক্লিনিকে। তার এপয়নমেন্ট নিলাম।

তিন বছরের আমাদের কাছে সিলেট ও ঢাকার ৪২ জন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখে তিনি হতবাক। তিনি ইবনে সিনার একটি রিপোর্ট দেখিয়ে বললেন, এই রিপোর্টই সমস্যার মূল কারন। তিনি আমার কাছে ডাক্তার সমাজের পক্ষ থেকে ক্ষমা চান। বললেন, ডাক্তাররা কেউ পেছনে ফিরে তাকাননি। একজন যে ভুল করেছেন, সবাই সেই ভুল পথেই হেটেছেন। অযথাই আপনাদের কষ্ট দিয়েছেন। ভাগ্য ভালো যে আপনারা এখনো অপারেশন করেননি। অপারেশন করালে সত্যি সব’নাশ হয়ে যেত।

কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি। এই ঔষধ এক সপ্তাহ খাওয়ার পর প্রয়োজনে আমাকে এই ফোন নাম্বারে আমাকে জানাবেন। ঔষধ ৮০ টাকার কিনে আমরা বাসায় চলে এলাম। এই ঔষধ বেবহারের পর আজ পযন্ত কোন সমস্যা হয়নি।

ঢাকা-সিলেট দৌড়াদৌড়ি আর ডাক্তার দেখানোতে আমাদের তিন বছরে প্রায় তিন লাখ খরচ হয়ে গিয়েছিল চিকিৎসা না করেই। এখন তার আর কোন সমস্যা নেই। আল্লাহর রহমতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে এই ৮০টাকার ঔষধ সেবন করেই।

শিক্ষা :
রোগ যতদিন চিহ্নিত না হবে, ততদিন নতুন ডাক্তারকে কখনও পুরাতন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখাবেন না। তাহলে নিজে মাথা না ঘামিয়ে পুরনো সেই ভুলটাই পূনরায় করবে। কাউকে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেবেন অনেক ভেবে-চিন্তে। শুধু ডাক্তার বললেই আত্মঘাতী এই সিদ্ধান্ত নেবেন না। ডাক্তারের কথায় অপারেশন করালে আমাদের সন্তানটি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারত না।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ